প্রিন্ট এর তারিখ : ০৯ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৯ আগস্ট ২০২৬
৩৯ লাখ টাকার প্রকল্পে খাল খনন ও বৃক্ষরোপণ, মাস না যেতেই মরল তিন শতাধিক চারা
মো. সাইফুল ইসলাম , নীলফামারী প্রতিনিধি ||
সরকারি অর্থে প্রায় ৩৯ লাখ টাকা ব্যয়ে খাল খনন ও বৃক্ষরোপণ প্রকল্প বাস্তবায়নের এক মাস না যেতেই তিন শতাধিক গাছের চারা মারা গেছে। খালের দুই পাশে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য রোপণ করা এসব চারার অধিকাংশই এখন শুকিয়ে মরে পড়ে আছে। কোথাও চারার পাতা ঝরে গেছে, কোথাও পড়ে আছে শুধু শুকনো ডালপালা। চারার গোড়ায় নিয়মিত পানি দেওয়া বা পরিচর্যারও কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা দেখা যায়নি।একই সঙ্গে খনন শেষ হওয়ার এক মাসের মধ্যেই খালের বিভিন্ন স্থানে পাড় ভাঙতে শুরু করেছে। এতে প্রকল্পের বাস্তবায়ন, কাজের মান, চারা রোপণ ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ের হিসাবেও রয়েছে অসঙ্গতি। বিশেষ করে চারা ও গার্ডের জন্য নির্ধারিত ব্যয় বর্তমান বাজারদরের তুলনায় বেশি বলে দাবি তাদের।উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির (ইজিপিপি) আওতায় কিশোরগঞ্জ উপজেলার পুটিমারি ইউনিয়নের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত প্রায় দেড় কিলোমিটার অংশে খাল খনন করা হয়। এ কাজে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৯ লাখ টাকা।প্রকল্পের আওতায় খালের দুই পাশে ৭০০টি তালগাছ ও ১ হাজার ২০০টি ফলজ গাছের চারা রোপণের কথা বলা হয়েছে। তালগাছের চারা রোপণ ও গাছ ঘিরে রাখার জন্য প্রতি চারায় ৫০১ টাকা এবং ফলজ চারার জন্য ৫০ টাকা করে ব্যয় ধরা হয়েছে।তবে স্থানীয় বাজারদর অনুযায়ী, একটি তালগাছের চারা প্রায় ৭০ টাকা এবং প্লাস্টিক নেটের গার্ড প্রায় ২০০ টাকায় পাওয়া যায় বলে দাবি এলাকাবাসীর। আর ফলজ গাছের চারা প্রজাতিভেদে ২০ থেকে ৩০ টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। এ হিসাবে তালগাছের চারা ও গার্ড বাবদ নির্ধারিত ৫০১ টাকা এবং ফলজ চারার ৫০ টাকা ব্যয়ের সঙ্গে বাজারদরের উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।স্থানীয়দের প্রশ্ন, প্রকল্পের বরাদ্দের টাকা কীভাবে ব্যয় করা হয়েছে এবং প্রকৃতপক্ষে কত দামে চারা ও গার্ড কেনা হয়েছে—তা যাচাই করা হয়েছে কি না।সরেজমিনে পুটিমারি ইউনিয়নের ওই এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, খালের দুই পাশে সারি করে গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। বেশ কিছু চারার চারপাশে নেটের গার্ড রয়েছে। তবে গার্ডের ভেতরে অনেক চারা শুকিয়ে মরে গেছে। কোথাও পাতাহীন চারা দাঁড়িয়ে আছে, আবার কোথাও শুকনো ডালপালা পড়ে রয়েছে।স্থানীয়দের ভাষ্য, রোপণের পর চারাগুলোর নিয়মিত পরিচর্যা ও পানি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়নি। ফলে প্রচণ্ড রোদ ও পানির অভাবে অল্প সময়ের মধ্যেই অনেক চারা মারা গেছে।এদিকে খালের বিভিন্ন অংশে পাড় ভাঙার চিত্রও দেখা গেছে। স্থানীয়দের দাবি, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় ধাইজান নদীর ওই অংশ খনন করা হয়েছিল। পরে সেটিকে খাল দেখিয়ে ফের খনন করা হয়েছে। ফলে নতুন করে খননকাজের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।স্থানীয় বাসিন্দা মনোয়ার হোসেন বলেন, “খাল খননের কথা শুনে আমরা খুশি হয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, এতে কৃষকরা উপকৃত হবেন। কিন্তু গাছ লাগানোর পর সেগুলোর ঠিকমতো পরিচর্যা করা হয়নি। এক মাস না যেতেই অনেক গাছ মারা গেছে। খালের পাড়েও ভাঙন দেখা দিয়েছে।”খালেক উদ্দিন বলেন, “দুই পাশে গাছের চারা লাগানো হয়েছে। কিন্তু এক মাস না যেতেই প্রায় ৩০০ গাছ মারা গেছে। ভালো মানের চারা লাগানো হয়নি বলেই মনে হচ্ছে। শুধু চারার ঘেরগুলো দেখা যাচ্ছে, ভেতরে চারা মরে পড়ে আছে।”আরেক বাসিন্দা সামছুল হক বলেন, “শুনেছি একটি গাছে ৫০১ টাকা করে ব্যয় ধরা হয়েছে। এত টাকা ব্যয় হলে গাছের অবস্থা এমন হওয়ার কথা নয়। বরাদ্দের টাকা সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা তদন্ত করা দরকার।”প্রকল্প সভাপতি ও পুটিমারি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, “প্রকল্পটি আমার নামে আছে, আমি সভাপতি। ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলার মুকুল ভাই সহযোগিতা করছেন। মুকুল ভাই ২০০ তালগাছের চারা ম্যানেজ করে দিয়েছেন। সেখানে পরিচর্যার গাফিলতি আছে। মরা গাছগুলো নতুন করে লাগানো হবে।”চারা কেনার বিষয়ে তিনি বলেন, “কোনো তালগাছ ৪০ টাকা, আবার কোনোটি ৮০ টাকা দরে কেনা হয়েছে।”উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. লতিফুর রহমান বলেন, “সেখানে ৭০০টি তালগাছ লাগানোর কথা থাকলেও আমরা এক হাজার লাগিয়েছি। যেসব গাছ মারা গেছে, সেগুলো নতুন করে লাগানোর জন্য বলা হয়েছে।”তবে প্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী নির্ধারিত ব্যয় ও স্থানীয় বাজারদরের পার্থক্য এবং রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতির বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি।কিশোরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুর রহমান বলেন, “বিষয়টি জানালেন। সেখানে কোনো ধরনের অনিয়ম থাকলে তা খতিয়ে দেখা হবে।”সরকারি অর্থ ব্যয়ে বাস্তবায়িত একটি পরিবেশবান্ধব প্রকল্পের গাছের চারা এক মাসের মধ্যেই মারা যাওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তাদের দাবি, প্রকল্পের ব্যয়, চারা ও গার্ড কেনার প্রকৃত মূল্য, রোপণ করা চারার সংখ্যা, খাল খননের পরিমাণ এবং রক্ষণাবেক্ষণ—সবকিছু নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হোক।তাদের মতে, শুধু মরা গাছের জায়গায় নতুন চারা লাগালেই সমস্যার সমাধান হবে না। সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি নতুন চারাগুলোর টেকসই রক্ষণাবেক্ষণ করা না হলে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত আজকের ডোমার