প্রিন্ট এর তারিখ : ১৮ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৮ আগস্ট ২০২৬
শ্রবণ প্রতিবন্ধী মেধাবী ফরিদুলের সংগ্রামী গল্প
মো. সাইফুল ইসলাম , নীলফামারী প্রতিনিধি ||
শারীরিক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধকতা তাঁর পথ আটকে দিতে পারেনি। দারিদ্র্য, পারিবারিক সংকট আর নানা সামাজিক প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন ফরিদুল ইসলাম। নীলফামারী সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগ থেকে অনার্স কোর্সের চূড়ান্ত পরীক্ষা সম্পন্ন করেছেন তিনি। একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি শিখেছেন কম্পিউটারের বিভিন্ন কাজও। এখন তাঁর স্বপ্ন খুব বড় কিছু নয়—নিজের যোগ্যতায় একটি স্থায়ী কর্মসংস্থান। সেই আয়ের মাধ্যমে পরিবারের পাশে দাঁড়াতে চান তিনি।ফরিদুল ইসলাম নীলফামারী সদর উপজেলার রামনগর ইউনিয়নের বিশমুড়ী পাইলাভাঙ্গা এলাকার রফিকুল ইসলামের ছেলে। চার ভাই-বোনের মধ্যে তিনি পরিবারের বড় ছেলে। তাঁর বাবা রফিকুল ইসলাম কৃষি শ্রমিক হিসেবে অন্যের জমিতে কাজ করেন। পাশাপাশি বাঁশ-বেতের কাজ করে সংসারের ব্যয় মেটানোর চেষ্টা করেন। বয়সের ভারে শারীরিকভাবেও আগের মতো সক্ষম নন। সামান্য এই আয়েই সংসার চালানো ও ছেলের পড়াশোনার খরচ জোগানো তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।ফরিদুলের মা ফরিদা বেগমও দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন রোগে ভুগছেন। চিকিৎসার খরচসহ পরিবারের নিত্যদিনের ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁদের। এমন বাস্তবতায় পরিবারের বড় ছেলে ফরিদুলের কাছে এখন শুধু একটি চাকরি নয়, কর্মসংস্থান মানে পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ।পরিবার সূত্রে জানা যায়, জন্মের পাঁচ-ছয় বছর পর হঠাৎ ফরিদুলের শ্রবণশক্তিতে সমস্যা দেখা দেয়। পাশাপাশি তাঁর দুই পায়েও শারীরিক সমস্যা রয়েছে। ছোটবেলা থেকেই এসব প্রতিবন্ধকতার কারণে তাঁকে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে শুনতে না পারায় পড়াশোনা ও সামাজিক যোগাযোগেও তৈরি হয়েছে নানা বাধা। অনেক সময় অন্যের সহযোগিতা নিয়ে এগোতে হয়েছে তাঁকে। কিন্তু প্রতিবন্ধকতাকে নিজের জীবনের সীমা হিসেবে মেনে নেননি ফরিদুল।অভাবের সংসারে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া তাঁর জন্য ছিল প্রতিদিনের লড়াই। বাবার সামান্য আয়, মায়ের অসুস্থতা এবং নিজের শারীরিক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও তিনি পড়াশোনা চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত ইতিহাস বিভাগ থেকে অনার্স কোর্সের চূড়ান্ত পরীক্ষা সম্পন্ন করেন। পড়াশোনায় ভালো করার পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে সম্মাননাও অর্জন করেছেন তিনি।শুধু একাডেমিক শিক্ষায় থেমে থাকেননি ফরিদুল। ভবিষ্যতে নিজেকে কর্মক্ষম করে তুলতে কম্পিউটারের বিভিন্ন কাজ শেখেন। মাইক্রোসফট এক্সেল, ফটোকপি, ছবি প্রিন্টসহ কম্পিউটার পরিচালনার নানা কাজে দক্ষতা অর্জন করেছেন। এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও সনদও রয়েছে তাঁর। ফলে সুযোগ পেলে কম্পিউটারভিত্তিক ডেস্কের কাজসহ বিভিন্ন ধরনের কর্মসংস্থানে নিজেকে যুক্ত করার সক্ষমতা রয়েছে তাঁর।তবে শিক্ষাজীবন শেষ করার পরও তাঁর সামনে খুলছে না কর্মসংস্থানের দরজা। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য আবেদন করেছেন ফরিদুল। শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দক্ষতার কথা জানিয়েছেন। কিন্তু শ্রবণ প্রতিবন্ধকতার কারণে অনেক জায়গাতেই কাঙ্ক্ষিত সুযোগ পাননি। ফলে মেধা, শিক্ষা ও দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও কর্মহীন হয়ে বসে থাকতে হচ্ছে তাঁকে।ফরিদুলের স্কুলশিক্ষক শামসুল হক বলেন, ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সমাজের বোঝা নন। উপযুক্ত সুযোগ ও সহযোগিতা পেলে তাঁরাও দেশের সম্পদ হতে পারেন। ফরিদুল মেধাবী ও পরিশ্রমী। পড়াশোনার পাশাপাশি সে কম্পিউটারের বিভিন্ন কাজ শিখেছে। সুযোগ পেলে সে ভালো কিছু করতে পারবে।’রামনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ‘ফরিদুলের মতো মেধাবী ও সংগ্রামী তরুণদের জন্য সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। প্রতিবন্ধী কোটা বা বিশেষ সহায়তার আওতায় যোগ্য তরুণদের চাকরির সুযোগ দেওয়া হলে তাঁরা নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পাশাপাশি পরিবার ও দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারবেন।’ফরিদুলের বাবা রফিকুল ইসলামের কণ্ঠে সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ। তিনি বলেন, ‘সংসার চালাতে অন্যের জমিতে কৃষি শ্রমিক হিসেবে কাজ করি। পাশাপাশি বাঁশ-বেতের কাজও করি। বয়স হয়েছে, শরীরও আর আগের মতো চলে না। ছেলেকে পড়াশোনা করাতে অনেক কষ্ট করেছি। এখন সংসারের হাল ধরার সময় ফরিদুলের। ছেলেটা একটা কাজ পেলে আমাদের কষ্ট অনেকটা কমত।’ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা শেষ করেছি। প্রতিবন্ধকতা আমাকে থামাতে পারেনি। কম্পিউটারের বিভিন্ন কাজও শিখেছি। আমার একটাই চাওয়া—সরকার বা কোনো প্রতিষ্ঠান যদি আমাকে একটি কর্মসংস্থানের সুযোগ দেয়, তাহলে আমি নিজের যোগ্যতায় কাজ করে পরিবারের দায়িত্ব নিতে পারব।’একজন বাবার জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে দুশ্চিন্তা, ফরিদুলের পরিবারের গল্পে সেটিই যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যে বাবা নিজের সামর্থ্যের সীমা অতিক্রম করে ছেলের পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন, এখন অন্যের জমিতে শ্রম বিক্রি করে ও বাঁশ-বেতের কাজ করে সংসার চালান। তাঁর চোখে এখন একটাই প্রত্যাশা—ছেলে নিজের পায়ে দাঁড়াবে।আর ফরিদুলের চাওয়াও খুব বেশি নয়। কারও করুণা নয়, দয়া নয়; নিজের শিক্ষা ও দক্ষতার মূল্যায়ন চান তিনি। চান একটি কাজ, যেখানে তাঁর শ্রবণ ও শারীরিক প্রতিবন্ধকতার চেয়ে তাঁর মেধা, যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে শিক্ষাজীবনের দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া ফরিদুলের সামনে এখন নতুন লড়াই—কর্মসংস্থানের লড়াই। একটি স্থায়ী চাকরি বা উপযুক্ত কাজ পেলে শুধু তাঁর জীবনই বদলাবে না, কিছুটা স্বস্তি ফিরতে পারে অসুস্থ মা-বাবার জীবনেও। পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে দায়িত্ব নিতে পারবেন তিনি, কমতে পারে বাবার কষ্টের বোঝাও।ফরিদুলের গল্প শুধু একজন প্রতিবন্ধী তরুণের চাকরি না পাওয়ার গল্প নয়; এটি একজন মেধাবী তরুণের স্বাবলম্বী হওয়ার আকাঙ্ক্ষার গল্প। তাঁর প্রয়োজন সহানুভূতির চেয়ে বেশি—প্রয়োজন যোগ্যতার মূল্যায়ন, একটি সুযোগ এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পথ। সেই সুযোগের অপেক্ষাতেই এখন দিন গুনছেন নীলফামারীর ফরিদুল ইসলাম।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত আজকের ডোমার