কুষ্টিয়ার দিকে যারা একবারও গিয়েছেন, তারা জানেন পদ্মার বালুচর কতটা বিস্তৃত হয়েছে। একসময় যেখানে নৌকা চলত, সেখানে এখন গরু চরে। শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানি পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে ওঠায় কৃষকেরা এখন ওই চরেই বোরো ধান চাষ করছে। এই বাস্তবতা অবশ্য নতুন নয়। ১৯৭৫ সালে ভারত ফারাক্কা বাঁধ চালু করার পর থেকেই পদ্মার পানিপ্রবাহ ধীরে ধীরে কমতে থাকে। কলকাতা বন্দরের নাব্য রক্ষার জন্য নেওয়া ওই সিদ্ধান্তের মাশুল গত পাঁচ দশক ধরে দিচ্ছে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল।
ওই ক্ষতির প্রতিকার হিসেবেই এবার একনেকে অনুমোদন পেল ‘পদ্মা ব্যারেজ’ প্রকল্প। প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে ব্যয় হবে ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকা। আগামী জুলাই থেকে ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে সরকারি অর্থায়নে তা বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। রাজবাড়ীর পাংশায় নির্মিত হবে ২.১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ব্যারেজ; যাতে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডার স্লুইস ও দুটি ফিশ পাস। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সংখ্যাগুলো যেমন বিশাল, উদ্দেশ্যও তেমনই। কিন্তু এর পেছনের প্রশ্নগুলোও কম নয়। বিশেষ করে সামনে আসছে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্ন। ভারতের সহযোগিতা ছাড়া এ প্রকল্পের সুফল মিলবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের কেউ কেউ তাই প্রকৃতি ও পরিবেশ বিধ্বংসী পদ্মা ব্যারেজ না বানিয়ে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি কীভাবে গ্যারান্টি ক্লজসহ শুষ্ক মৌসুমে আরো বেশি পানি এবং পলি পাওয়া যাবে সেই লক্ষ্যে কাজ করার পরামর্শ দিচ্ছেন সরকারকে।
১৯৭৫ সালে ভারতের ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর থেকেই বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ছবিটা বদলে যেতে শুরু করে। শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার পানিপ্রবাহ এতটাই কমে যায় যে হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতীর মতো নদীগুলো এখন কার্যত মৃত। দেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৩৭ শতাংশ জুড়ে থাকা এই অঞ্চলে বাস করেন এক-তৃতীয়াংশ মানুষ। অথচ দীর্ঘকাল ধরে এখানকার কৃষি, মৎস্য, নৌপথ ও জীববৈচিত্র্যে একটানা ক্ষয় চলছে। খুলনা-সাতক্ষীরার কৃষিজমিতে লবণাক্ততা এখন স্থায়ী অতিথি, আর মিঠাপানির অভাবে সুন্দরবনে বাড়ছে গাছের আগামরা রোগ (টপ ডাইং)। এই চরম বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতেই পদ্মা ব্যারেজের ধারণাটি বারবার সামনে এসেছে।
তাহলে এই প্রকল্প কী দেবে আমাদের? সংক্ষেপে বললে অনেক কিছু, অন্তত প্রকল্পের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করে তাই বলা হচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে প্রায় দুই হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা যাবে। মৃতপ্রায় পাঁচটি নদীতে প্রবাহ ফেরানো যাবে। হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী, এই নদীগুলো এখন নামেই নদী। শুষ্ক মৌসুমে পানি থাকে না বললেই চলে। ব্যারেজ চালু হলে এসব নদীতে বছরের একটা বড় অংশ পানির প্রবাহ থাকবে। সেটা শুধু নদীর জন্য না, আশপাশের মানুষের জীবিকার জন্যও জরুরি।
কৃষিতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসার কথা। প্রায় ২৯ লাখ হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ নিশ্চিত হবে। এই জমিগুলো এখন ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতিবছর নামছে। রাজশাহী বা চাঁপাইনবাবগঞ্জের যে কোনো কৃষককে জিজ্ঞেস করলে বলবেন, বিশ বছর আগে যেখানে পঞ্চাশ ফুট নামলে পানি পাওয়া যেত, এখন সেখানে আরও গভীরে যেতে হচ্ছে। ব্যারেজ থেকে নদীতে পানি এলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমবে, সেচের খরচও কমবে।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী প্রতিবছর ধান উৎপাদন বাড়বে ২৪ লাখ টন, মাছ বাড়বে সোয়া দুই লাখ টন। এই সংখ্যাগুলো বড়, কিন্তু অবাস্তব না। নদীতে পানি থাকলে মাছ থাকে। মাছ থাকলে জেলেদের সংসার চলে। পানির প্রবাহ থাকলে নৌপথ সচল হয়, পণ্য পরিবহনের খরচ কমে।
তার ওপর থাকছে ১১৩ মেগাওয়াটের জলবিদ্যুৎ। এটা খুব বড় সংখ্যা নয়, জাতীয় চাহিদার তুলনায়। তবে স্থানীয়ভাবে সেচ পাম্প চালাতে এই বিদ্যুৎ কাজে আসবে। আর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে শীতলীকরণের জন্য যে পানি লাগে, ওই সরবরাহও নিশ্চিত হবে এই ব্যারেজের মাধ্যমে।
সুন্দরবনের কথাও আলাদা করে বলতে হয়। দক্ষিণের নদীগুলোতে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় সুন্দরবনে লবণাক্ততা বাড়ছে। গাছের আগা শুকিয়ে যাওয়ার ঘটনা ইতোমধ্যে বিশেষজ্ঞরা নথিভুক্ত করেছেন। নদীতে পানি ফিরলে এই চাপ কিছুটা হলেও কমবে।
জাতীয় জিডিপিতে শূন্য দশমিক ৪৫ শতাংশ অবদান এবং বছরে আট হাজার কোটি টাকার প্রত্যক্ষ আর্থিক সুফলের কথাও বলা হচ্ছে। কাগজে হিসাবটা ভালো শোনাচ্ছে। কিন্তু শেষপর্যন্ত কাজটা কেমন হবে, সেটাই আসল। কিন্তু সম্ভাবনাটুকু এখানে সত্যিই আছে। এই সংখ্যাগুলো কি বিশ্বাসযোগ্য?
এই প্রকল্পের সামনে কিছু কঠিন প্রশ্ন আছে। প্রথম প্রশ্নটা পলি নিয়ে। গঙ্গা পৃথিবীর অন্যতম পলিবহুল নদী। ফারাক্কার অভিজ্ঞতা বলে, ব্যারেজের উজানে পলি জমে নদীর তলা ভরাট হয়ে যায়, যার ফলে বন্যা ও ভাঙন বাড়ে। এই পলি জমার কারণেই ভারতের বিহার রাজ্য ফারাক্কা বাঁধ তুলে দেওয়ার দাবি তুলেছে। বাংলাদেশেও যাতে একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না হয়, তার জন্য কোনো উন্নত পলি ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা আছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
দ্বিতীয় প্রশ্নটা ভূরাজনীতির। ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ এই বছরের ডিসেম্বরেই শেষ হচ্ছে। চুক্তি নবায়নের আলোচনা যখন এমনিতেই নাজুক, তখন পদ্মা ব্যারেজ ঘোষণা সম্পর্কটাকে কোথায় নিয়ে যাবে? ভারত স্বাভাবিকভাবেই এটাকে তার পানিপ্রবাহের ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখবে। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী নিজের ভূখণ্ডের পানি ব্যবস্থাপনার অধিকার বাংলাদেশের আছে। নিজ ভূখণ্ডে পানি ব্যবস্থাপনার অধিকার প্রতিটি রাষ্ট্রের আছে। ভারত নিজেও বাংলাদেশের মতামত না নিয়ে উজানে একাধিক বাঁধ দিয়েছে। কাজেই কূটনৈতিক চাপ সামলানোর সক্ষমতা থাকলে এই প্রকল্প থামানোর আইনি ভিত্তি কারও নেই।
তৃতীয় প্রশ্নটা অর্থায়নের। প্রতি বছর পাঁচ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব থেকে ঢালতে হবে সাত বছর ধরে। এই মুহূর্তে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি আর আইএমএফের শর্তের চাপে যে অর্থনীতি, তাতে এই বোঝা কতটা সামলানো যাবে? বহুপাক্ষিক সংস্থা থেকে অর্থায়নের সম্ভাবনা এখনো অস্পষ্ট। আর চীনের প্রসঙ্গ রাজনৈতিকভাবে জটিল। টাকার উৎস পরিষ্কার না হলে পরে এই প্রকল্পই বড় আর্থিক চাপ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তবে এখানে নামকরণের একটি কৌশলগত প্রশ্ন থেকে যায়। এই ব্যারেজের নাম 'পদ্মা ব্যারেজ' না হয়ে 'গঙ্গা ব্যারেজ' হওয়া উচিত ছিল। কারণ, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দিক থেকে গঙ্গার ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের যে আন্তর্জাতিক অধিকার রয়েছে, সেই দাবিটিকে নামের মাধ্যমে জিইয়ে রাখা জরুরি। আমরা যদি 'পদ্মা' নাম দিয়ে বিষয়টিকে সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ হিসেবে দেখাই, তবে গঙ্গার হিস্যা আদায়ের আন্তর্জাতিক যুক্তি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
বড় প্রকল্পের ইতিহাস সম্পর্কে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বেশ স্পষ্ট। প্রায় প্রতিটি মেগা প্রকল্পে সময় ও ব্যয় দুটোই কয়েকগুণ বেড়েছে। পদ্মা সেতু ওই ধারার আংশিক ব্যতিক্রম হলেও সেখানে রাজনৈতিক সংকল্পের মাত্রা ছিল অসাধারণ। পদ্মা ব্যারেজ তার চেয়ে অনেক বেশি প্রযুক্তিগতভাবে জটিল। নদীর গতিপথ, পলি জমা আর পানির আচরণ সবকিছু ধাপে ধাপে সামলাতে হবে। যদি পর্যায়ক্রমিক বাস্তবায়নের রোডম্যাপ ঠিকঠাক মানা না হয়, প্রতিটি বিলম্ব পরবর্তী ধাপকে আরও ব্যয়বহুল করে তুলবে।
সর্বোপরি এই প্রকল্প কতটা দরকার এ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে দ্বিমত আছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পদ্মার পানি ভবিষ্যতে আরও কমবে, উপকূলীয় লবণাক্ততা বাড়বে, দক্ষিণ-পশ্চিমের কৃষি আরও কঠিন হবে। এই বাস্তবতায় প্রকল্পটি বিলম্বিত করলে ক্ষতিই বাড়বে বলে অনেকেই মনে করছেন।
কিন্তু অনুমোদন দিলেই কাজ শেষ হয় না। কুষ্টিয়ার কৃষক, চাঁপাইয়ের ফলচাষী, খুলনার জেলে, সুন্দরবনের বাওয়ালি এরা কেউ একনেকের কার্যবিবরণী পড়বেন না। তারা দেখবেন নদীতে পানি ফিরল কিনা, জমিতে সেচ পৌঁছাল কিনা, মাছ ফিরল কিনা। ওই পরীক্ষায় পাস করার দায় এখন সরকারের।

বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ মে ২০২৬
কুষ্টিয়ার দিকে যারা একবারও গিয়েছেন, তারা জানেন পদ্মার বালুচর কতটা বিস্তৃত হয়েছে। একসময় যেখানে নৌকা চলত, সেখানে এখন গরু চরে। শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানি পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে ওঠায় কৃষকেরা এখন ওই চরেই বোরো ধান চাষ করছে। এই বাস্তবতা অবশ্য নতুন নয়। ১৯৭৫ সালে ভারত ফারাক্কা বাঁধ চালু করার পর থেকেই পদ্মার পানিপ্রবাহ ধীরে ধীরে কমতে থাকে। কলকাতা বন্দরের নাব্য রক্ষার জন্য নেওয়া ওই সিদ্ধান্তের মাশুল গত পাঁচ দশক ধরে দিচ্ছে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল।
ওই ক্ষতির প্রতিকার হিসেবেই এবার একনেকে অনুমোদন পেল ‘পদ্মা ব্যারেজ’ প্রকল্প। প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে ব্যয় হবে ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকা। আগামী জুলাই থেকে ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে সরকারি অর্থায়নে তা বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। রাজবাড়ীর পাংশায় নির্মিত হবে ২.১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ব্যারেজ; যাতে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডার স্লুইস ও দুটি ফিশ পাস। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সংখ্যাগুলো যেমন বিশাল, উদ্দেশ্যও তেমনই। কিন্তু এর পেছনের প্রশ্নগুলোও কম নয়। বিশেষ করে সামনে আসছে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্ন। ভারতের সহযোগিতা ছাড়া এ প্রকল্পের সুফল মিলবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের কেউ কেউ তাই প্রকৃতি ও পরিবেশ বিধ্বংসী পদ্মা ব্যারেজ না বানিয়ে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি কীভাবে গ্যারান্টি ক্লজসহ শুষ্ক মৌসুমে আরো বেশি পানি এবং পলি পাওয়া যাবে সেই লক্ষ্যে কাজ করার পরামর্শ দিচ্ছেন সরকারকে।
১৯৭৫ সালে ভারতের ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর থেকেই বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ছবিটা বদলে যেতে শুরু করে। শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার পানিপ্রবাহ এতটাই কমে যায় যে হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতীর মতো নদীগুলো এখন কার্যত মৃত। দেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৩৭ শতাংশ জুড়ে থাকা এই অঞ্চলে বাস করেন এক-তৃতীয়াংশ মানুষ। অথচ দীর্ঘকাল ধরে এখানকার কৃষি, মৎস্য, নৌপথ ও জীববৈচিত্র্যে একটানা ক্ষয় চলছে। খুলনা-সাতক্ষীরার কৃষিজমিতে লবণাক্ততা এখন স্থায়ী অতিথি, আর মিঠাপানির অভাবে সুন্দরবনে বাড়ছে গাছের আগামরা রোগ (টপ ডাইং)। এই চরম বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতেই পদ্মা ব্যারেজের ধারণাটি বারবার সামনে এসেছে।
তাহলে এই প্রকল্প কী দেবে আমাদের? সংক্ষেপে বললে অনেক কিছু, অন্তত প্রকল্পের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করে তাই বলা হচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে প্রায় দুই হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা যাবে। মৃতপ্রায় পাঁচটি নদীতে প্রবাহ ফেরানো যাবে। হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী, এই নদীগুলো এখন নামেই নদী। শুষ্ক মৌসুমে পানি থাকে না বললেই চলে। ব্যারেজ চালু হলে এসব নদীতে বছরের একটা বড় অংশ পানির প্রবাহ থাকবে। সেটা শুধু নদীর জন্য না, আশপাশের মানুষের জীবিকার জন্যও জরুরি।
কৃষিতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসার কথা। প্রায় ২৯ লাখ হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ নিশ্চিত হবে। এই জমিগুলো এখন ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতিবছর নামছে। রাজশাহী বা চাঁপাইনবাবগঞ্জের যে কোনো কৃষককে জিজ্ঞেস করলে বলবেন, বিশ বছর আগে যেখানে পঞ্চাশ ফুট নামলে পানি পাওয়া যেত, এখন সেখানে আরও গভীরে যেতে হচ্ছে। ব্যারেজ থেকে নদীতে পানি এলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমবে, সেচের খরচও কমবে।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী প্রতিবছর ধান উৎপাদন বাড়বে ২৪ লাখ টন, মাছ বাড়বে সোয়া দুই লাখ টন। এই সংখ্যাগুলো বড়, কিন্তু অবাস্তব না। নদীতে পানি থাকলে মাছ থাকে। মাছ থাকলে জেলেদের সংসার চলে। পানির প্রবাহ থাকলে নৌপথ সচল হয়, পণ্য পরিবহনের খরচ কমে।
তার ওপর থাকছে ১১৩ মেগাওয়াটের জলবিদ্যুৎ। এটা খুব বড় সংখ্যা নয়, জাতীয় চাহিদার তুলনায়। তবে স্থানীয়ভাবে সেচ পাম্প চালাতে এই বিদ্যুৎ কাজে আসবে। আর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে শীতলীকরণের জন্য যে পানি লাগে, ওই সরবরাহও নিশ্চিত হবে এই ব্যারেজের মাধ্যমে।
সুন্দরবনের কথাও আলাদা করে বলতে হয়। দক্ষিণের নদীগুলোতে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় সুন্দরবনে লবণাক্ততা বাড়ছে। গাছের আগা শুকিয়ে যাওয়ার ঘটনা ইতোমধ্যে বিশেষজ্ঞরা নথিভুক্ত করেছেন। নদীতে পানি ফিরলে এই চাপ কিছুটা হলেও কমবে।
জাতীয় জিডিপিতে শূন্য দশমিক ৪৫ শতাংশ অবদান এবং বছরে আট হাজার কোটি টাকার প্রত্যক্ষ আর্থিক সুফলের কথাও বলা হচ্ছে। কাগজে হিসাবটা ভালো শোনাচ্ছে। কিন্তু শেষপর্যন্ত কাজটা কেমন হবে, সেটাই আসল। কিন্তু সম্ভাবনাটুকু এখানে সত্যিই আছে। এই সংখ্যাগুলো কি বিশ্বাসযোগ্য?
এই প্রকল্পের সামনে কিছু কঠিন প্রশ্ন আছে। প্রথম প্রশ্নটা পলি নিয়ে। গঙ্গা পৃথিবীর অন্যতম পলিবহুল নদী। ফারাক্কার অভিজ্ঞতা বলে, ব্যারেজের উজানে পলি জমে নদীর তলা ভরাট হয়ে যায়, যার ফলে বন্যা ও ভাঙন বাড়ে। এই পলি জমার কারণেই ভারতের বিহার রাজ্য ফারাক্কা বাঁধ তুলে দেওয়ার দাবি তুলেছে। বাংলাদেশেও যাতে একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না হয়, তার জন্য কোনো উন্নত পলি ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা আছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
দ্বিতীয় প্রশ্নটা ভূরাজনীতির। ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ এই বছরের ডিসেম্বরেই শেষ হচ্ছে। চুক্তি নবায়নের আলোচনা যখন এমনিতেই নাজুক, তখন পদ্মা ব্যারেজ ঘোষণা সম্পর্কটাকে কোথায় নিয়ে যাবে? ভারত স্বাভাবিকভাবেই এটাকে তার পানিপ্রবাহের ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখবে। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী নিজের ভূখণ্ডের পানি ব্যবস্থাপনার অধিকার বাংলাদেশের আছে। নিজ ভূখণ্ডে পানি ব্যবস্থাপনার অধিকার প্রতিটি রাষ্ট্রের আছে। ভারত নিজেও বাংলাদেশের মতামত না নিয়ে উজানে একাধিক বাঁধ দিয়েছে। কাজেই কূটনৈতিক চাপ সামলানোর সক্ষমতা থাকলে এই প্রকল্প থামানোর আইনি ভিত্তি কারও নেই।
তৃতীয় প্রশ্নটা অর্থায়নের। প্রতি বছর পাঁচ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব থেকে ঢালতে হবে সাত বছর ধরে। এই মুহূর্তে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি আর আইএমএফের শর্তের চাপে যে অর্থনীতি, তাতে এই বোঝা কতটা সামলানো যাবে? বহুপাক্ষিক সংস্থা থেকে অর্থায়নের সম্ভাবনা এখনো অস্পষ্ট। আর চীনের প্রসঙ্গ রাজনৈতিকভাবে জটিল। টাকার উৎস পরিষ্কার না হলে পরে এই প্রকল্পই বড় আর্থিক চাপ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তবে এখানে নামকরণের একটি কৌশলগত প্রশ্ন থেকে যায়। এই ব্যারেজের নাম 'পদ্মা ব্যারেজ' না হয়ে 'গঙ্গা ব্যারেজ' হওয়া উচিত ছিল। কারণ, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দিক থেকে গঙ্গার ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের যে আন্তর্জাতিক অধিকার রয়েছে, সেই দাবিটিকে নামের মাধ্যমে জিইয়ে রাখা জরুরি। আমরা যদি 'পদ্মা' নাম দিয়ে বিষয়টিকে সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ হিসেবে দেখাই, তবে গঙ্গার হিস্যা আদায়ের আন্তর্জাতিক যুক্তি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
বড় প্রকল্পের ইতিহাস সম্পর্কে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বেশ স্পষ্ট। প্রায় প্রতিটি মেগা প্রকল্পে সময় ও ব্যয় দুটোই কয়েকগুণ বেড়েছে। পদ্মা সেতু ওই ধারার আংশিক ব্যতিক্রম হলেও সেখানে রাজনৈতিক সংকল্পের মাত্রা ছিল অসাধারণ। পদ্মা ব্যারেজ তার চেয়ে অনেক বেশি প্রযুক্তিগতভাবে জটিল। নদীর গতিপথ, পলি জমা আর পানির আচরণ সবকিছু ধাপে ধাপে সামলাতে হবে। যদি পর্যায়ক্রমিক বাস্তবায়নের রোডম্যাপ ঠিকঠাক মানা না হয়, প্রতিটি বিলম্ব পরবর্তী ধাপকে আরও ব্যয়বহুল করে তুলবে।
সর্বোপরি এই প্রকল্প কতটা দরকার এ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে দ্বিমত আছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পদ্মার পানি ভবিষ্যতে আরও কমবে, উপকূলীয় লবণাক্ততা বাড়বে, দক্ষিণ-পশ্চিমের কৃষি আরও কঠিন হবে। এই বাস্তবতায় প্রকল্পটি বিলম্বিত করলে ক্ষতিই বাড়বে বলে অনেকেই মনে করছেন।
কিন্তু অনুমোদন দিলেই কাজ শেষ হয় না। কুষ্টিয়ার কৃষক, চাঁপাইয়ের ফলচাষী, খুলনার জেলে, সুন্দরবনের বাওয়ালি এরা কেউ একনেকের কার্যবিবরণী পড়বেন না। তারা দেখবেন নদীতে পানি ফিরল কিনা, জমিতে সেচ পৌঁছাল কিনা, মাছ ফিরল কিনা। ওই পরীক্ষায় পাস করার দায় এখন সরকারের।

আপনার মতামত লিখুন