চলতি আমন মৌসুমে নীলফামারীতে সারের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সরকারি নির্ধারিত মূল্যে সার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন কৃষকরা। তাঁদের দাবি, বাজারে বস্তাপ্রতি ১৫০ থেকে সর্বোচ্চ ৮৫০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে টিএসপি সারের সংকটকে ঘিরে বেড়েছে ভোগান্তি। কোথাও কোথাও রসিদ ছাড়াই চড়া দামে সার বিক্রির অভিযোগও উঠেছে।
কৃষকদের অভিযোগ, দোকানে সরকারি মূল্যতালিকা টাঙানো থাকলেও নির্ধারিত দামে সার পাওয়া যাচ্ছে না। রসিদ চাইলে অনেক ব্যবসায়ী সার দিতে অনীহা প্রকাশ করেন। এতে একদিকে বাড়ছে উৎপাদন খরচ, অন্যদিকে ধানের কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় লোকসানের আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে নীলফামারীতে ১ লাখ ১৩ হাজার ২২০ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ চাষাবাদ থেকে ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৬৯২ মেট্রিক টন চাল উৎপাদনের প্রত্যাশা করছে কৃষি বিভাগ। এরই মধ্যে প্রায় ৯৭ শতাংশ জমিতে রোপণ সম্পন্ন হয়েছে। এখন ধানখেতে সার প্রয়োগ ও পরিচর্যার গুরুত্বপূর্ণ সময়। ঠিক এ সময়েই সারের বাজারে অস্থিরতা দেখা দেওয়ায় বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা।
উৎপাদন বাড়াতে স্থানীয় কৃষকরা ব্রি-৪৯, ব্রি-৭৫, ব্রি-৮০, ব্রি-৮৭ ও বিনা-১৭সহ বিভিন্ন উচ্চফলনশীল (উফশী) জাতের ধান চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। কৃষকদের চাহিদা বিবেচনায় বিএডিসি পর্যাপ্ত পরিমাণ রাসায়নিক সার আগাম মজুত করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। জেলার নিবন্ধিত ডিলারদের মাধ্যমে ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি সার সরবরাহ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিটি ডিলারের অধীনে তিনজন উপ-ডিলারের মাধ্যমে প্রান্তিক পর্যায়ে সার সরবরাহ নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে কাগজে-কলমে সারের সংকট না থাকার কথা থাকলেও মাঠপর্যায়ে ভিন্ন চিত্রের অভিযোগ করছেন কৃষকরা।
কৃষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৫০ কেজির এক বস্তা ইউরিয়া সারের সরকারি নির্ধারিত মূল্য ১ হাজার ৩৫০ টাকা। অথচ খুচরা বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায়। অর্থাৎ বস্তাপ্রতি ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি অভিযোগ টিএসপি সার নিয়ে। ১ হাজার ৩৫০ টাকা নির্ধারিত মূল্যের এক বস্তা টিএসপি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায়। এতে বস্তাপ্রতি ৫৫০ থেকে ৮৫০ টাকা পর্যন্ত বেশি গুনতে হচ্ছে কৃষকদের।
এ ছাড়া ১ হাজার ৫০ টাকা নির্ধারিত মূল্যের ডিএপি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায়। একই দামের এমওপি বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৪০০ টাকায়।
ডোমার উপজেলার কৃষক আমিনুর রহমান বলেন, ‘দোকানে তালিকামূল্য ঝোলানো থাকলে কী হবে, সেই দামে সার পাওয়া যায় না। বেশি দামেই কিনতে হচ্ছে। মেমো চাইলে অনেক সময় সারই দিতে চান না।’ নীলাহাটি এলাকার কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘সারের পাশাপাশি জমি প্রস্তুত, শ্রমিক ও সেচসহ সব খরচ বেড়েছে। কিন্তু ধানের দাম সে অনুযায়ী বাড়ছে না। বাড়তি দামে সার কিনলে আবাদ করে লাভ করা কঠিন হয়ে যাবে।’
তবে বাড়তি দামে সার বিক্রির অভিযোগের দায় নিতে নারাজ খুচরা ব্যবসায়ীরা। তাঁদের দাবি, অনেক সময় ডিলারদের কাছ থেকেই সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার সংগ্রহ করতে হয়। একাধিক খুচরা ব্যবসায়ী জানান, গ্রামাঞ্চলে অনেক কৃষক বাকিতে সার নেন। ফসল ওঠার পর তাঁরা টাকা পরিশোধ করেন। দীর্ঘ সময় মূলধন আটকে থাকা, টাকা আদায়ের ঝুঁকি ও পরিবহন ব্যয়ের কারণে বাকিতে দেওয়া সারের দাম কিছুটা বেশি ধরা হয়।
তবে নগদ ক্রেতাদের কাছ থেকে বেশি দাম নেওয়ার বিষয়ে ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে সার সংগ্রহ করতে হয়। অনেক সময় বেশি দাম দিয়েও সার আনতে হয়। এর সঙ্গে পরিবহন ব্যয় যুক্ত হওয়ায় তাঁদেরও বেশি দামে সার বিক্রি করতে হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গোমনাতি বাজারের এক সার ব্যবসায়ী বলেন, ‘কৃষকদের অভিযোগ সত্য। তবে সব দায় খুচরা ব্যবসায়ীদের নয়। ডিলারদের কাছ থেকে বেশি দামে সার কিনতে হলে আমাদেরও বেশি দামে বিক্রি করতে হয়। নিয়মিত নজরদারি করলে প্রকৃত সমস্যা বেরিয়ে আসবে।’
এদিকে ডোমার উপজেলায় কয়েকজন বড় সার ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন জেলা থেকে গোপনে সার সংগ্রহ করে গুদামজাত করার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় খুচরা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এসব মজুতদার সরবরাহ সংকটের সুযোগ নিয়ে সার আটকে রাখেন। পরে বাজারে চাহিদা বাড়লে বেশি দামে তা বিক্রি করেন।
বিশেষ করে টিএসপি সারের সংকটের পেছনে অতিরিক্ত মজুতের ভূমিকা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। তাঁদের অভিযোগ, স্বাভাবিক সরবরাহ থাকলেও বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে বড় মজুতদারদের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের আরও অভিযোগ, জেলার একাধিক বিসিআইসি ডিলার নিজেদের নামে বরাদ্দ পাওয়া সার অন্যের মাধ্যমে অথবা ‘ভাড়ায়’ ডিলারশিপ পরিচালনার মাধ্যমে বাজারজাত করছেন। তাঁদের দাবি, একাধিক নাম ব্যবহার করে ডিলারশিপ পরিচালনা ও বরাদ্দকৃত সার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে একটি চক্র বাজারে প্রভাব বিস্তার করছে।
কয়েকজন ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, এসব ডিলারের কেউ কেউ সার সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত। তবে অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ডিলারদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
জেলার বিএডিসি ও বিসিআইসি ডিলারদের দাবি, চাহিদার তুলনায় সারের প্রাপ্যতা কিছুটা কম থাকলেও তাঁরা সরকারি নির্ধারিত মূল্যের বাইরে সার বিক্রি করছেন না। তাঁদের ভাষ্য, প্রত্যন্ত এলাকার কিছু খুচরা ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
বিসিআইসি ডিলারদের দাবি, তাঁদের পর্যায়ে কোনো ডিলার কৃষকদের কাছ থেকে বাড়তি দাম নিচ্ছেন না। তবে খুচরা পর্যায়ে কেন নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি হচ্ছে, তা তদারকি করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তাঁরা।
কৃষকদের দাবি, শুধু খুচরা দোকানে অভিযান চালিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। সার সরবরাহের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাপনা তদারকি করতে হবে। ডিলারদের বরাদ্দ, উত্তোলন, মজুত ও বিক্রির হিসাবের পাশাপাশি খুচরা ব্যবসায়ীদের ক্রয়-বিক্রয়ের রসিদও যাচাই করা প্রয়োজন।
কৃষকদের প্রশ্ন, সরকারি গুদাম ও ডিলার পর্যায় থেকে নির্ধারিত মূল্যে সার সরবরাহ করা হলে খুচরা বাজারে গিয়ে বস্তাপ্রতি কয়েক শ টাকা দাম বাড়ছে কীভাবে? সরবরাহ ব্যবস্থার কোন পর্যায়ে অতিরিক্ত দাম যুক্ত হচ্ছে, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
কৃষকরা বলছেন, সময়মতো এবং নির্ধারিত দামে সার না পেলে আমন উৎপাদনের খরচ আরও বাড়বে। অথচ ধানের দাম উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে শেষ পর্যন্ত লোকসানের বোঝা তাঁদেরই বহন করতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আমন মৌসুমের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সারের বাজার নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। সরকারি মূল্যের সঙ্গে বাজারদরের বড় ব্যবধানের কারণ খুঁজে বের করতে ডিলার থেকে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত প্রতিটি স্তরের মজুত, বরাদ্দ ও লেনদেনের হিসাব যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কৃত্রিম সংকট, অতিরিক্ত মজুত ও নির্ধারিত মূল্যের বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন কৃষকরা।

শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ আগস্ট ২০২৬
চলতি আমন মৌসুমে নীলফামারীতে সারের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সরকারি নির্ধারিত মূল্যে সার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন কৃষকরা। তাঁদের দাবি, বাজারে বস্তাপ্রতি ১৫০ থেকে সর্বোচ্চ ৮৫০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে টিএসপি সারের সংকটকে ঘিরে বেড়েছে ভোগান্তি। কোথাও কোথাও রসিদ ছাড়াই চড়া দামে সার বিক্রির অভিযোগও উঠেছে।
কৃষকদের অভিযোগ, দোকানে সরকারি মূল্যতালিকা টাঙানো থাকলেও নির্ধারিত দামে সার পাওয়া যাচ্ছে না। রসিদ চাইলে অনেক ব্যবসায়ী সার দিতে অনীহা প্রকাশ করেন। এতে একদিকে বাড়ছে উৎপাদন খরচ, অন্যদিকে ধানের কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় লোকসানের আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে নীলফামারীতে ১ লাখ ১৩ হাজার ২২০ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ চাষাবাদ থেকে ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৬৯২ মেট্রিক টন চাল উৎপাদনের প্রত্যাশা করছে কৃষি বিভাগ। এরই মধ্যে প্রায় ৯৭ শতাংশ জমিতে রোপণ সম্পন্ন হয়েছে। এখন ধানখেতে সার প্রয়োগ ও পরিচর্যার গুরুত্বপূর্ণ সময়। ঠিক এ সময়েই সারের বাজারে অস্থিরতা দেখা দেওয়ায় বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা।
উৎপাদন বাড়াতে স্থানীয় কৃষকরা ব্রি-৪৯, ব্রি-৭৫, ব্রি-৮০, ব্রি-৮৭ ও বিনা-১৭সহ বিভিন্ন উচ্চফলনশীল (উফশী) জাতের ধান চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। কৃষকদের চাহিদা বিবেচনায় বিএডিসি পর্যাপ্ত পরিমাণ রাসায়নিক সার আগাম মজুত করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। জেলার নিবন্ধিত ডিলারদের মাধ্যমে ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি সার সরবরাহ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিটি ডিলারের অধীনে তিনজন উপ-ডিলারের মাধ্যমে প্রান্তিক পর্যায়ে সার সরবরাহ নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে কাগজে-কলমে সারের সংকট না থাকার কথা থাকলেও মাঠপর্যায়ে ভিন্ন চিত্রের অভিযোগ করছেন কৃষকরা।
কৃষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৫০ কেজির এক বস্তা ইউরিয়া সারের সরকারি নির্ধারিত মূল্য ১ হাজার ৩৫০ টাকা। অথচ খুচরা বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায়। অর্থাৎ বস্তাপ্রতি ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি অভিযোগ টিএসপি সার নিয়ে। ১ হাজার ৩৫০ টাকা নির্ধারিত মূল্যের এক বস্তা টিএসপি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায়। এতে বস্তাপ্রতি ৫৫০ থেকে ৮৫০ টাকা পর্যন্ত বেশি গুনতে হচ্ছে কৃষকদের।
এ ছাড়া ১ হাজার ৫০ টাকা নির্ধারিত মূল্যের ডিএপি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায়। একই দামের এমওপি বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৪০০ টাকায়।
ডোমার উপজেলার কৃষক আমিনুর রহমান বলেন, ‘দোকানে তালিকামূল্য ঝোলানো থাকলে কী হবে, সেই দামে সার পাওয়া যায় না। বেশি দামেই কিনতে হচ্ছে। মেমো চাইলে অনেক সময় সারই দিতে চান না।’ নীলাহাটি এলাকার কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘সারের পাশাপাশি জমি প্রস্তুত, শ্রমিক ও সেচসহ সব খরচ বেড়েছে। কিন্তু ধানের দাম সে অনুযায়ী বাড়ছে না। বাড়তি দামে সার কিনলে আবাদ করে লাভ করা কঠিন হয়ে যাবে।’
তবে বাড়তি দামে সার বিক্রির অভিযোগের দায় নিতে নারাজ খুচরা ব্যবসায়ীরা। তাঁদের দাবি, অনেক সময় ডিলারদের কাছ থেকেই সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার সংগ্রহ করতে হয়। একাধিক খুচরা ব্যবসায়ী জানান, গ্রামাঞ্চলে অনেক কৃষক বাকিতে সার নেন। ফসল ওঠার পর তাঁরা টাকা পরিশোধ করেন। দীর্ঘ সময় মূলধন আটকে থাকা, টাকা আদায়ের ঝুঁকি ও পরিবহন ব্যয়ের কারণে বাকিতে দেওয়া সারের দাম কিছুটা বেশি ধরা হয়।
তবে নগদ ক্রেতাদের কাছ থেকে বেশি দাম নেওয়ার বিষয়ে ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে সার সংগ্রহ করতে হয়। অনেক সময় বেশি দাম দিয়েও সার আনতে হয়। এর সঙ্গে পরিবহন ব্যয় যুক্ত হওয়ায় তাঁদেরও বেশি দামে সার বিক্রি করতে হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গোমনাতি বাজারের এক সার ব্যবসায়ী বলেন, ‘কৃষকদের অভিযোগ সত্য। তবে সব দায় খুচরা ব্যবসায়ীদের নয়। ডিলারদের কাছ থেকে বেশি দামে সার কিনতে হলে আমাদেরও বেশি দামে বিক্রি করতে হয়। নিয়মিত নজরদারি করলে প্রকৃত সমস্যা বেরিয়ে আসবে।’
এদিকে ডোমার উপজেলায় কয়েকজন বড় সার ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন জেলা থেকে গোপনে সার সংগ্রহ করে গুদামজাত করার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় খুচরা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এসব মজুতদার সরবরাহ সংকটের সুযোগ নিয়ে সার আটকে রাখেন। পরে বাজারে চাহিদা বাড়লে বেশি দামে তা বিক্রি করেন।
বিশেষ করে টিএসপি সারের সংকটের পেছনে অতিরিক্ত মজুতের ভূমিকা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। তাঁদের অভিযোগ, স্বাভাবিক সরবরাহ থাকলেও বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে বড় মজুতদারদের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের আরও অভিযোগ, জেলার একাধিক বিসিআইসি ডিলার নিজেদের নামে বরাদ্দ পাওয়া সার অন্যের মাধ্যমে অথবা ‘ভাড়ায়’ ডিলারশিপ পরিচালনার মাধ্যমে বাজারজাত করছেন। তাঁদের দাবি, একাধিক নাম ব্যবহার করে ডিলারশিপ পরিচালনা ও বরাদ্দকৃত সার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে একটি চক্র বাজারে প্রভাব বিস্তার করছে।
কয়েকজন ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, এসব ডিলারের কেউ কেউ সার সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত। তবে অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ডিলারদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
জেলার বিএডিসি ও বিসিআইসি ডিলারদের দাবি, চাহিদার তুলনায় সারের প্রাপ্যতা কিছুটা কম থাকলেও তাঁরা সরকারি নির্ধারিত মূল্যের বাইরে সার বিক্রি করছেন না। তাঁদের ভাষ্য, প্রত্যন্ত এলাকার কিছু খুচরা ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
বিসিআইসি ডিলারদের দাবি, তাঁদের পর্যায়ে কোনো ডিলার কৃষকদের কাছ থেকে বাড়তি দাম নিচ্ছেন না। তবে খুচরা পর্যায়ে কেন নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি হচ্ছে, তা তদারকি করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তাঁরা।
কৃষকদের দাবি, শুধু খুচরা দোকানে অভিযান চালিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। সার সরবরাহের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাপনা তদারকি করতে হবে। ডিলারদের বরাদ্দ, উত্তোলন, মজুত ও বিক্রির হিসাবের পাশাপাশি খুচরা ব্যবসায়ীদের ক্রয়-বিক্রয়ের রসিদও যাচাই করা প্রয়োজন।
কৃষকদের প্রশ্ন, সরকারি গুদাম ও ডিলার পর্যায় থেকে নির্ধারিত মূল্যে সার সরবরাহ করা হলে খুচরা বাজারে গিয়ে বস্তাপ্রতি কয়েক শ টাকা দাম বাড়ছে কীভাবে? সরবরাহ ব্যবস্থার কোন পর্যায়ে অতিরিক্ত দাম যুক্ত হচ্ছে, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
কৃষকরা বলছেন, সময়মতো এবং নির্ধারিত দামে সার না পেলে আমন উৎপাদনের খরচ আরও বাড়বে। অথচ ধানের দাম উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে শেষ পর্যন্ত লোকসানের বোঝা তাঁদেরই বহন করতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আমন মৌসুমের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সারের বাজার নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। সরকারি মূল্যের সঙ্গে বাজারদরের বড় ব্যবধানের কারণ খুঁজে বের করতে ডিলার থেকে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত প্রতিটি স্তরের মজুত, বরাদ্দ ও লেনদেনের হিসাব যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কৃত্রিম সংকট, অতিরিক্ত মজুত ও নির্ধারিত মূল্যের বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন কৃষকরা।

আপনার মতামত লিখুন