আজকের ডোমার

কৃষকের জানালা

আগাম আলুতে বড় বিনিয়োগ, ভালো দামের আশায় ঝুঁকি নিচ্ছেন কৃষকেরা

আমন ধান কাটার পরপরই উঁচু জমিতে আগাম আলু রোপণে ব্যস্ত সময় পার করছেন নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার কৃষকেরা। শীত আসার আগেই নতুন আলু বাজারে তুলে তুলনামূলক বেশি দাম পাওয়ার আশায় বিনা-৭, গ্রানুলা, সানশাইন, কারেজসহ বিভিন্ন জাতের আলু রোপণ করছেন তাঁরা। তবে জমি ইজারা, বীজ, সার, জমি প্রস্তুত ও শ্রমিকের মজুরি মিলিয়ে শুরুতেই বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। এর মধ্যে সার সংকট ও সরকারি ডিলার পয়েন্টে চাহিদামতো সার না পাওয়ার অভিযোগে ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন কৃষকেরা। ফলে বাড়তি দামে সার কিনে উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে যাওয়ায় আগাম আলু চাষে ঝুঁকিও বাড়ছে।কৃষকেরা বলছেন, মৌসুমের শুরুতে নতুন আলুর দাম তুলনামূলক বেশি থাকে। এ কারণে বাড়তি লাভের আশায় আগাম আলু চাষে ঝুঁকি নিচ্ছেন তাঁরা। গত মৌসুমে আলুর বাজারদর কম থাকায় অনেকে লোকসানে পড়লেও এবার সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা করছেন। তবে সার, বীজ, শ্রমিক ও জমির ইজারা খরচ বেড়ে যাওয়ায় ভালো ফলনের পাশাপাশি ভালো বাজারদর না পেলে বিনিয়োগ তুলে আনা কঠিন হতে পারে।সরেজমিনে দেখা যায়, কিশোরগঞ্জ উপজেলার বাহাগিলী, নিতাই, পুটিমারী, গাড়াগ্রাম ও রণচণ্ডী ইউনিয়নের বিভিন্ন মাঠে আমন ধান কাটার পর জমি প্রস্তুত করে আলু রোপণ করছেন কৃষকেরা। নীলফামারী সদর উপজেলার চাপড়া সরমজানি ও কচুকাটা ইউনিয়নেও চলছে আগাম আলু চাষের প্রস্তুতি। কোথাও রোপণ শেষ হয়েছে, কোথাও চলছে বীজ বাছাই ও জমি প্রস্তুতের কাজ। এতে মাঠে কৃষক ও কৃষিশ্রমিকদের ব্যস্ততা বেড়েছে। পাশাপাশি বেড়েছে শ্রমিকের চাহিদা।বাহাগিলী ইউনিয়নের পশ্চিমপাড়া গ্রামের কৃষক আনারুল ইসলাম দুই বিঘা জমি ৪০ হাজার টাকায় ইজারা নিয়ে আগাম আলু চাষ করছেন। নিজের জমি না থাকায় জমির ভাড়ার পাশাপাশি বীজ, জৈব ও রাসায়নিক সার, জমি প্রস্তুত ও শ্রমিকের পেছনে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে তাঁর। তাঁর আশা, ভালো ফলন ও বাজারদর পেলে বিনিয়োগের অর্থ উঠে আসার পাশাপাশি লাভ হবে।একই ইউনিয়নের উত্তর দুরাকুটি পশ্চিমপাড়া গ্রামের কৃষক মিনহাজুল ইসলাম ৭০ শতাংশ জমিতে আগাম আলু রোপণ করেছেন। তিনি বলেন, জমি ইজারা, হালচাষ, শ্রমিক ও কৃষি উপকরণসহ আলু তোলা পর্যন্ত প্রায় ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা খরচ হতে পারে। বাজার ভালো থাকলে প্রতি কেজি আলু ৯০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রির আশা করছেন তিনি।সার সংকটের বিষয়ে চাপড়া সরমজানি ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কৃষক সাদিকুল ইসলাম বলেন, শনিবার ডিএপি ও পটাশ সার নিতে গেলে কৃষি কর্মকর্তা উপস্থিত না থাকায় ডিলারের প্রতিনিধি তাঁকে সার দিতে অস্বীকৃতি জানান। তাঁর ভাষ্য, এ সময় কৃষি কর্মকর্তার উপস্থিতি ছাড়া সার দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানানো হয়। পরে কৃষি কর্মকর্তা তাঁকে জানান, পরিচিত কৃষক হলে সার দেওয়া সম্ভব হলেও তিনি অপরিচিত হওয়ায় সার দেওয়া সম্ভব হয়নি।এ বিষয়ে কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি ডিলার পয়েন্টে চাহিদার তুলনায় সার সরবরাহ কম থাকায় প্রয়োজনমতো সার পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে অনেককে বাধ্য হয়ে বেশি দামে খোলা বাজার থেকে সার কিনতে হচ্ছে। এতে আলু চাষের শুরুতেই উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।রণচণ্ডী ইউনিয়নের কৃষক আব্দুস সাত্তার বলেন, গত মৌসুমে আগাম আলু তুলে মৌসুমের শুরুতে প্রতি কেজি ৯০ টাকা দরে বিক্রি করেছিলেন। এতে এক বিঘা জমিতে প্রায় ৩০ হাজার টাকা লাভ হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে এবার ৪০ শতাংশ জমিতে আগাম আলু চাষ করেছেন তিনি।তবে আগাম আলু চাষে সবার অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। উত্তর দুরাকুটি গ্রামের কৃষক শামীম হোসেন বাবু জানান, গত দুই বছরে আলু চাষ করে লোকসানে পড়েছেন তিনি। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশায় এবারও আগাম আলু চাষ করেছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং ন্যায্য দাম পাওয়া গেলে এবার ঘুরে দাঁড়ানোর আশা তাঁর।কচুকাটা বন্দরপাড়া এলাকার কৃষক মনছুর আলী দুই বিঘা জমিতে আলু রোপণ করেছেন। তিনি বলেন, প্রতি বছরই এলাকায় আগাম আলু চাষ হয়। হিমাগার থেকে সংরক্ষিত আলু এনে বীজ হিসেবে ব্যবহার করায় খরচ কিছুটা বেশি হয়েছে। তবে বাজারে ভালো দাম পেলে লাভ হবে।যাদুরহাট এলাকার কৃষক মহসিন আলী পাঁচ বিঘা জমিতে আগাম আলু চাষ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, এলাকার ডাঙ্গা জমি উঁচু ও বালুমিশ্রিত হওয়ায় পানি জমে থাকার আশঙ্কা তুলনামূলক কম। এ কারণে আগেভাগে আলু চাষ করে বাড়তি লাভের চেষ্টা করছেন তিনি।কৃষকদের মতে, আগাম আলু চাষে আবহাওয়া ও বাজারদর—দুটিই বড় ঝুঁকি। অতিরিক্ত বৃষ্টি, রোগবালাই কিংবা বাজারে দরপতন হলে উৎপাদন খরচ তোলা কঠিন হতে পারে। এর সঙ্গে সারসহ কৃষি উপকরণের দাম ও প্রাপ্যতার অনিশ্চয়তা যোগ হওয়ায় ঝুঁকি আরও বাড়ছে। বিশেষ করে ইজারা নেওয়া জমিতে চাষ করা কৃষকদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। কারণ উৎপাদন খরচের সঙ্গে জমির ভাড়াও যোগ হচ্ছে।আলু চাষকে কেন্দ্র করে স্থানীয় শ্রমবাজারেও কর্মচাঞ্চল্য বেড়েছে। কৃষক ও শ্রমিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কিশোরগঞ্জে পুরুষ শ্রমিকরা দৈনিক ৫০০ টাকা এবং নারী শ্রমিকরা ৩৫০ টাকা মজুরিতে কাজ করছেন।কিশোরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লোকমান আলম বলেন, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ৪ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে আগাম আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সার সরবরাহ নিশ্চিত করতেও কৃষি বিভাগ কাজ করছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ভালো ফলন ও বাজারদর পেয়ে কৃষকেরা লাভবান হবেন বলে আশা করেন তিনি।নীলফামারী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোছা. হোমায়রা মন্ডল বলেন, চলতি মৌসুমে জেলায় ২২ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে আগাম আলুর লক্ষ্যমাত্রা ৮ হাজার ৩০০ হেক্টর। এ পর্যন্ত প্রায় ৫ হেক্টর জমিতে আলু রোপণ হয়েছে। তবে গত বছরের তুলনায় এবার আলু চাষ কিছুটা কমতে পারে। বর্তমান আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় উঁচু জমিতে আলু চাষের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। নিচু জমিতে আবহাওয়ার পরিস্থিতি বিবেচনা করে রোপণের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।স্থানীয় কৃষি বিভাগ বলছে, আগাম আলুর উৎপাদন অনেকটাই নির্ভর করে আবহাওয়া, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ, ফলন এবং মৌসুমের শুরুর বাজারদরের ওপর। ফলে ভালো দাম পাওয়ার সম্ভাবনা যেমন রয়েছে, তেমনি উৎপাদন খরচের তুলনায় কম দাম হলে কৃষকের লোকসানের আশঙ্কাও রয়েছে।

আগাম আলুতে বড় বিনিয়োগ, ভালো দামের আশায় ঝুঁকি নিচ্ছেন কৃষকেরা